জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে, বিয়ে, চাকরি, ব্যবসা, বিদেশ যাত্রা, কোনটা কল্যাণকর হবে, তা আমরা নিশ্চিত জানি না। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে এমন মুহূর্তে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার একটি সুন্দর পদ্ধতি: সালাতুল ইস্তিখারা। সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শেখাতেন (সহিহ বুখারি)। এই গাইডে জানবেন ইস্তিখারা কী, কীভাবে পড়বেন, দোয়ার অর্থ কী, এবং এ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো।
সংক্ষেপে: ইস্তিখারা হলো দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে হাদিসে শেখানো দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া। যেকোনো বৈধ সিদ্ধান্তের আগে পড়া যায়। স্বপ্নে ইশারা পাওয়া শর্ত নয়; ইস্তিখারার পর যে দিকে মন প্রশান্ত হয় এবং কাজ সহজ হয়ে আসে, সেটিই কল্যাণের দিক।
ইস্তিখারা কী এবং কখন করবেন?
"ইস্তিখারা" অর্থ কল্যাণ চাওয়া, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে চাওয়া যে, দুটি বৈধ পথের মধ্যে যেটি আমার দ্বীন, দুনিয়া ও পরিণামের জন্য ভালো, সেটি আমার জন্য সহজ করে দিন। মনে রাখবেন:
- ইস্তিখারা করা হয় বৈধ (হালাল) বিষয়ে, যেখানে দুই বা একাধিক বিকল্পের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
- ফরজ বা হারাম বিষয়ে ইস্তিখারা নেই, ফরজ করতেই হবে, হারাম ছাড়তেই হবে।
- সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ (মাশওয়ারা) করাও সুন্নাহসম্মত; ইস্তিখারা ও পরামর্শ একসাথে চলে।
ইস্তিখারার নামাজ পড়ার নিয়ম
পদ্ধতিটি খুব সহজ, সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী:
- অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন (ফরজ নামাজ ছাড়া আলাদাভাবে)।
- নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পড়ুন।
- এরপর হাদিসে বর্ণিত ইস্তিখারার দোয়া পড়ুন এবং দোয়ার নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করুন বা মনে মনে স্মরণ করুন।
- তারপর যেদিকে মন সায় দেয় এবং পরিস্থিতি সহজ হয়, সেদিকে অগ্রসর হোন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে।
ইস্তিখারার দোয়ার অর্থ
দোয়াটি সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত। এর মর্মার্থ বাংলায়:
আরবি মূল দোয়াটি মুখস্থ করা উত্তম। মুখস্থ না থাকলে দেখে দেখে পড়া যাবে, এবং মুখস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ভালো।
বাস্তব জীবনে ইস্তিখারার উদাহরণ
কোন কোন পরিস্থিতিতে ইস্তিখারা করা যায়, কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ:
- বিয়ের প্রস্তাব: পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে।
- চাকরি বা ক্যারিয়ার: দুটি অফারের মধ্যে বাছাই, চাকরি বদলানো, বা নতুন শহরে যাওয়া।
- ব্যবসা ও বিনিয়োগ: নতুন ব্যবসা শুরু করা, অংশীদার নেওয়া, বড় কেনাকাটা (যেমন জমি বা ফ্ল্যাট)।
- পড়াশোনা: কোন বিষয়ে ভর্তি হবেন, দেশে না বিদেশে পড়বেন।
খেয়াল করুন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগে নিজের সাধ্যমতো তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা জরুরি। ইস্তিখারা গবেষণার বিকল্প নয়; বরং যাচাই-বাছাই শেষে আল্লাহর কাছে চূড়ান্ত কল্যাণ চাওয়া।
ইস্তিখারার কিছু আদব
- মন থেকে নিজের পছন্দ আল্লাহর ফয়সালার হাতে ছেড়ে দিন, আগে থেকেই এক দিকে মন স্থির করে রেখে "অনুমোদনের" জন্য ইস্তিখারা করা দোয়ার চেতনার পরিপন্থী।
- হালাল উপার্জন ও আন্তরিকতা দোয়া কবুলের সহায়ক; দোয়ার আদবগুলো ইস্তিখারাতেও প্রযোজ্য।
- তাড়াহুড়া করবেন না, "দোয়া কবুল হচ্ছে না" ভেবে হাল ছাড়া দোয়া কবুলের অন্তরায়, এ কথা হাদিসে এসেছে (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
- ইস্তিখারার পর যে সিদ্ধান্তই নিন, "আলহামদুলিল্লাহ" বলে অগ্রসর হোন এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করুন।
ইস্তিখারা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
- "স্বপ্ন দেখতেই হবে", না। হাদিসে স্বপ্নের কোনো শর্ত নেই। ইস্তিখারার ফল হলো অন্তরের প্রশান্তি ও কাজ সহজ হয়ে যাওয়া; স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়।
- "সবুজ বা সাদা দেখলে হ্যাঁ, লাল-কালো দেখলে না", এ ধরনের রঙের ব্যাখ্যার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
- "অন্যকে দিয়ে ইস্তিখারা করানো", সুন্নাহ হলো নিজে করা; নিজের প্রয়োজনে নিজের দোয়াই মুখ্য। অন্যের কাছে শুধু দোয়া চাওয়া যেতে পারে।
- "একবার করলেই তাৎক্ষণিক উত্তর আসবে", প্রয়োজনে ইস্তিখারা একাধিকবার করা যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় সাতবার পর্যন্ত করার কথা এসেছে, তবে সংখ্যা বাঁধা নয়।
ইস্তিখারার পরে করণীয়
ইস্তিখারার পর অন্তরে বিশেষ কোনো "সংকেত" খুঁজতে হবে না। যে দিকটি সহজ হয়ে আসে, বাস্তব পরিস্থিতি যেদিকে অনুকূল হয়, সেটিকেই কল্যাণ মনে করে অগ্রসর হোন। কোনো পথ যদি বারবার বন্ধ হয়ে যায়, সেটিও এক ধরনের উত্তর; আর যদি কাজ সহজে এগোতে থাকে, সেটিও। ফল যদি প্রত্যাশার বিপরীতও হয়, বিশ্বাস রাখুন যে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই কল্যাণ। এটিই ইস্তিখারার মূল শিক্ষা: সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা।
সাধারণ প্রশ্ন
ইস্তিখারার নামাজ কখন পড়া যায়?
দিন-রাতের যেকোনো সময় পড়া যায়, তবে নিষিদ্ধ সময় (সূর্যোদয়, ঠিক মধ্যাহ্ন ও সূর্যাস্তের মুহূর্ত) এড়িয়ে চলুন। রাতে ঘুমানোর আগে বা তাহাজ্জুদের সময় পড়া অনেকের কাছে সুবিধাজনক, কারণ তখন মন শান্ত থাকে।
নামাজ পড়া সম্ভব না হলে কি শুধু দোয়া করা যাবে?
বিশেষ ওজরে (যেমন এমন পরিস্থিতি যেখানে নামাজ পড়া সম্ভব নয়, বা মহিলাদের নামাজে বাধার দিনগুলোতে) আলেমগণ শুধু ইস্তিখারার দোয়া পড়ার অবকাশ দিয়েছেন। স্বাভাবিক অবস্থায় দুই রাকাত নামাজসহ করাই সুন্নাহ।
ইস্তিখারার পরেও মন দ্বিধায় থাকলে কী করব?
ইস্তিখারা আবার করুন, নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞ কারও সাথে পরামর্শ করুন, তারপর একটি দিক বেছে নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যান। "যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট" (সূরা তালাক, ৬৫:৩)।