দরুদ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠানো, এমন একটি আমল, যার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে দিয়েছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও" (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৬)। এই লেখায় জানবেন দরুদের অর্থ, সহিহ হাদিসে বর্ণিত ফজিলত, দরুদে ইব্রাহিম এবং কখন কীভাবে দরুদ পড়া উত্তম।

সংক্ষেপে: দরুদ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি সালাত ও সালাম পাঠানো। একবার দরুদ পড়লে আল্লাহ তাআলা দশটি রহমত দেন (সহিহ মুসলিম: ৪০৮)। জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়া বিশেষ সুন্নাহ, আর নামাজে পড়া দরুদে ইব্রাহিমই সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ।

দরুদ মানে কী?

দরুদ (আরবিতে "সালাত আলান নাবি") অর্থ আল্লাহর কাছে দোয়া করা, যেন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি রহমত, বরকত ও সম্মান বর্ষণ করেন। এটি একইসাথে আল্লাহর নির্দেশ পালন, নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ এবং নিজের জন্য রহমত লাভের মাধ্যম। সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রূপ: "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ", হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।

সহিহ হাদিসে দরুদের ফজিলত

  • একবার দরুদে দশ রহমত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠায়, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন" (সহিহ মুসলিম: ৪০৮)।
  • গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি: অন্য বর্ণনায় এসেছে, দশটি রহমতের সাথে দশটি গুনাহ মাফ হয় এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায় (নাসাঈ: ১২৯৭; শাইখ আলবানি এটিকে সহিহ বলেছেন)।
  • কিয়ামতের দিন নৈকট্য: "কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সে, যে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়ে" (তিরমিজি: ৪৮৪)।
  • দোয়ার সাথে দরুদ: উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না নবীর প্রতি দরুদ পড়া হয় (তিরমিজি: ৪৮৬), তাই দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পড়া উত্তম।

দরুদে ইব্রাহিম: সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ দরুদ

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনার প্রতি কীভাবে সালাত পাঠাব?" উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে দরুদ শিখিয়েছেন, তা-ই দরুদে ইব্রাহিম (সহিহ বুখারি: ৩৩৭০; সহিহ মুসলিম: ৪০৬), আমরা প্রতি নামাজের শেষ বৈঠকে এটি পড়ি। এর মর্মার্থ:

"হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের প্রতি বরকত দান করেছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।"

নামাজের বাইরে যেকোনো সহিহ বর্ণিত দরুদই পড়া যায়; সংক্ষিপ্ত রূপে "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বলাও দরুদের অন্তর্ভুক্ত।

দরুদ কখন পড়া উত্তম?

  • জুমার দিনে: "জুমার দিনে আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পড়ো" (আবু দাউদ: ১০৪৭; নাসাঈ: ১৩৭৪)।
  • নবীজির নাম শুনলে বা বললে: হাদিসে সে ব্যক্তিকে কৃপণ বলা হয়েছে, যার সামনে নবীর নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে দরুদ পড়ল না (তিরমিজি: ৩৫৪৬)।
  • আজানের পরে: আজানের জবাব দিয়ে দরুদ পড়া, তারপর ওসিলার দোয়া করা সুন্নাহ (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)।
  • দোয়ার শুরুতে ও শেষে: আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে দোয়া শুরু করা উত্তম।
  • প্রতি নামাজের শেষ বৈঠকে: দরুদে ইব্রাহিম পড়া।
  • যেকোনো সময়: হাঁটা-চলা, যানবাহন, কাজের ফাঁক, দরুদের জন্য অজু বা নির্দিষ্ট সময়ের শর্ত নেই।

দরুদ অন্তরে যা বদলে দেয়

দরুদ শুধু সওয়াবের হিসাব নয়, এটি নবীজি (সা.)-এর সাথে আমাদের সম্পর্কের চর্চা। যিনি নিয়মিত দরুদ পড়েন:

  • তার অন্তরে নবীজির প্রতি ভালোবাসা বাড়ে, আর ভালোবাসা বাড়লে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের আগ্রহও বাড়ে, এটিই দরুদের আসল ফল।
  • দুশ্চিন্তার সময় প্রশান্তি পান। এক সাহাবি বলেছিলেন, "আমি আমার দোয়ার পুরো সময় আপনার প্রতি দরুদে ব্যয় করব"; রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, "তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর করা হবে এবং তোমার গুনাহ মাফ করা হবে" (তিরমিজি: ২৪৫৭)।
  • জিহ্বা অনর্থক কথা থেকে ব্যস্ত থাকে উত্তম জিকিরে।

আরও একটি সান্ত্বনার বিষয়: হাদিসে এসেছে, পৃথিবীর যেখান থেকেই কেউ দরুদ ও সালাম পাঠায়, তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় (আবু দাউদ: ২০৪২; নাসাঈ: ১২৮২)। অর্থাৎ ঢাকার ঘর থেকে পড়া আপনার দরুদও পৌঁছে যায়।

দৈনন্দিন জীবনে দরুদের অভ্যাস গড়া

  • দিনে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা ঠিক করুন, যেমন ১০০ বার; খুব ব্যস্ত দিনে অন্তত ১০ বার হলেও ধারাবাহিকতা রাখুন।
  • যাতায়াতের সময়টিকে দরুদের সময় বানান, ঢাকার জ্যামও তখন সওয়াবের সুযোগ।
  • জুমার দিনে সংখ্যাটি বাড়িয়ে দিন, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই শুরু করতে পারেন।
  • পরিবারের ছোটদেরও সংক্ষিপ্ত দরুদ শেখান; নবীর প্রতি ভালোবাসা শৈশব থেকেই গড়ে উঠুক।

অভ্যাস গড়ার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দরুদকে দৈনন্দিন কোনো কাজের সাথে জুড়ে দেওয়া, যেমন প্রতিবার আজান শোনার পরে, প্রতি নামাজের পরে, বা ঘুমানোর আগে। এভাবে আলাদা করে মনে রাখতে হয় না; দিনের স্বাভাবিক ছন্দেই দরুদ চলে আসে। মাস শেষে হিসাব করলে দেখবেন, ছোট ছোট অভ্যাস মিলে হাজারো দরুদ জমা হয়ে গেছে, আর প্রতিটির বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশটি রহমত।

সাধারণ প্রশ্ন

দরুদ পড়তে কি অজু লাগে?

না, দরুদ জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, অজু ছাড়া, চলতে-ফিরতে, শুয়ে-বসে যেকোনো অবস্থায় পড়া যায়। তবে অজু অবস্থায়, মনোযোগের সাথে পড়া উত্তম। কাজের ফাঁকে মনে মনে পড়লেও দরুদ আদায় হয়ে যায়, কারণ এটি মূলত আল্লাহর কাছে একটি দোয়া।

কোন দরুদ পড়া সবচেয়ে ভালো?

সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য হলো দরুদে ইব্রাহিম, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত। এর বাইরে সংক্ষিপ্ত "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ" বা "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম"-ও দরুদ হিসেবে যথেষ্ট। হাদিসে ভিত্তিহীন বানোয়াট দরুদ (যার বিশেষ "গ্যারান্টিযুক্ত" ফজিলতের গল্প প্রচলিত) এড়িয়ে চলুন।

দিনে কতবার দরুদ পড়া উচিত?

নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক সংখ্যা নেই, যত বেশি, তত উত্তম। হাদিস অনুযায়ী প্রতিটি দরুদে দশটি রহমত; তাই নিজের সাধ্যমতো একটি দৈনিক অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং তা ধরে রাখুন।