যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। বছরে একবার, যেসব মুসলিম একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাদেরকে সেই সম্পদের ২.৫% দরিদ্র ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাঝে দান করতে হয়। বাংলাদেশে যাকাত হিসাব করার সময় টাকার অঙ্ক, সোনা-রূপার বাজারমূল্য, এবং নিসাবের সঠিক মান জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গাইডে আপনি জানবেন কীভাবে বাংলা টাকায় সহজে ও নির্ভুল যাকাত হিসাব করবেন।

নিসাব কী এবং বাংলা টাকায় কত?

নিসাব হলো যাকাত ফরজ হওয়ার ন্যূনতম সম্পদসীমা। দুই ধরনের নিসাব ব্যবহৃত হয়:

  • সোনার নিসাব: ৮৭.৪৮ গ্রাম (২০ মিসকাল) সোনা।
  • রূপার নিসাব: ৬১২.৩৬ গ্রাম (২০০ দিরহাম) রূপা।

২০২৬ সালের বাজারমূল্যে বাংলাদেশে সোনার নিসাবের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮-১০ লক্ষ টাকা, এবং রূপার নিসাবের মূল্য প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা। বেশিরভাগ আলেম দরিদ্রের পক্ষে রূপার নিসাব ব্যবহারের পরামর্শ দেন, কারণ এটি ছোট সীমা এবং বেশি মানুষকে যাকাতের সুবিধা পেতে দেয়।

সহজ ফর্মুলা: মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ × ২.৫% = প্রদেয় যাকাত।
উদাহরণ: যদি আপনার মোট সম্পদ ১,০০,০০০ টাকা হয়, যাকাত = ২,৫০০ টাকা।

কোন কোন সম্পদের উপর যাকাত?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত সম্পদের উপর যাকাত ফরজ:

  • নগদ অর্থ ও ব্যাংক ব্যালেন্স (সঞ্চয়, কারেন্ট, FDR সব মিলিয়ে)।
  • সোনা ও রূপা (গয়না সহ, যদিও কিছু মাজহাবে ব্যক্তিগত গয়না বাদ)।
  • ব্যবসার পণ্য (স্টক, ইনভেন্টরি, বিক্রির জন্য রাখা মাল)।
  • রিসিভেবল (পাওনা টাকা, যদি ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে)।
  • শেয়ার ও বিনিয়োগ (ট্রেডের উদ্দেশ্যে কিনলে)।
  • ফসল ও পশুসম্পদ (নির্দিষ্ট পরিমাণে)।

যা যাকাতের বাইরে: থাকার ঘর, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি, পোশাক, ব্যবহারের আসবাবপত্র ইত্যাদি।

লায়াবিলিটি বা দেনা বাদ দেওয়া

যাকাত হিসাবের সময় স্বল্পমেয়াদী দেনা (যেমন এ মাসের ক্রেডিট কার্ড বিল, ভাড়া বকেয়া) মোট সম্পদ থেকে বাদ দেওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদী লোন (যেমন হোম লোন) সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া যায় না; কেবল এই বছরের কিস্তি বাদ দিতে হবে।

একটি বাস্তব উদাহরণ

ধরা যাক রাহিম সাহেবের সম্পদ:
ব্যাংক ব্যালেন্স: ৩,০০,০০০ টাকা
সোনা (৪০ গ্রাম): প্রায় ৪,৬০,০০০ টাকা
ব্যবসার স্টক: ১,৫০,০০০ টাকা
পাওনা টাকা: ৫০,০০০ টাকা
মোট: ৯,৬০,০০০ টাকা

স্বল্পমেয়াদী দেনা: ৬০,০০০ টাকা
যাকাতযোগ্য সম্পদ: ৯,০০,০০০ টাকা
যাকাত: ৯,০০,০০০ × ২.৫% = ২২,৫০০ টাকা

যাকাত কাকে দেওয়া যাবে?

কুরআনে আট শ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে (সূরা তাওবা ৯:৬০):

  • ফকির ও মিসকিন (গরীব)।
  • যাকাত আদায়কারী (আমিল)।
  • নতুন মুসলিম, যাদের হৃদয় সান্ত্বনা প্রয়োজন।
  • দাসমুক্তি (বর্তমানে কম প্রাসঙ্গিক)।
  • ঋণগ্রস্ত।
  • ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে)।
  • মুসাফির।

বাংলাদেশে নিকটাত্মীয় (যেমন গরীব ভাই-বোন, চাচা-চাচী) এবং আশেপাশের প্রতিবেশীকে যাকাত দেওয়া বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। বড় NGO-তে দেওয়ার বদলে সরাসরি অভাবী ব্যক্তির হাতে পৌঁছানো বেশি বরকতময়।

যাকাত হিসাবের সঠিক সময়

আপনার সম্পদ এক চান্দ্রবর্ষ (হিজরি বছর) ধরে নিসাবের ওপরে থাকলে যাকাত ফরজ হয়। অনেকে রমজান মাসে যাকাত আদায় করেন, কারণ এই মাসে ভালো কাজের সওয়াব বহুগুণে বাড়ে। তবে যেদিন এক বছর পূর্ণ হয়, সেদিনের বাজারমূল্য দিয়ে হিসাব করতে হবে।